Tuesday, 12 July 2022

কবিতা

চিক বর্ষা সোঁদা টুপ পর্ব-১

রূপক চট্টোপাধ্যায় এর কবিতা-



১.
• বানভাসি •


ভোরের আলোর ভেতর পৃথিবীর বালিকা বয়স
হেঁটে যেতে দেখি। তিনটি লাল সিঁড়ি নামলেই 
সামনে সামুদ্রিক উঠোন। উঠোনে উবু হয়ে বসে
রাঙা দিদি আলপনা আঁকে।তার আঁকা লতাপাতায় 
জেগে থাকে রূপসী প্রজাতি, আড়ালে গিরগিটির 
জিভ নজরে পড়ে না! আলপনা শেষ হয়না কভু
উবু হয়ে বসেথাকা রাঙা দিদির শরীরে
বিচ্ছিন্ন দ্বীপেরনোনা ঢেউ লাগে,
 বিষন্ন সাইকেল উড়ে যায় 
কবেকার ওড়না উড়িয়ে স্কুলের দিকটায়! আবছায়া
পেয়ারা গাছে উঠে বসেছে বিশু মাস্টারের উড়নচণ্ডী 
মেয়েটা। আঁচলের পেয়ারা দিয়ে সাজাচ্ছিল 
মেঘের মনেস্ট্রি! তার সুজাতা বয়স তখন খোলা চুল।


এই স্রোত ক্রমশ প্রবাহিত হয় হলুদ জ্বরের মতো
উষ্ণ বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে। হঠাৎ চোখের
জল আসে স্মৃতির নদীতে। ডুবে যায় ধানিজমি! 



২.
• হাওয়া মোরগের গান •


সাইকেলের কেরিয়ারে একরত্তি মেয়ে,
সামনে হাড়ের স্তূপের ভেতর থেকে
প্রাণপণে প্যাডল ঘোরায় বাবা। চাকা ঘোরে,
একটু খানি গড়ায়, দাগ কেটে কেটে!
সামনে অনেকটা পথ, পৃথিবী নিজের মত
করে বিপদ সংকুল করেছে! সরল বাক্যের
মাথায় হাত উঁচিয়ে হঠাৎ পূর্ণচ্ছেদ বসিয়ে দিয়েছে! 
নামিয়ে দিয়েছে সান্ধ্যকালিন ক্লান্তি শিরা ও সন্তাপে!

একরত্তি মেয়ে তবুও চুল ঝাঁকিয়ে 
গেয়ে চলেছে হাওয়া মোরগের গান। তাই শুনতে
বৃষ্টির কার্ণিশে, উড়ে এসে বসলো 
তৃতীয়ার চন্দ্র ইসারা!



৩.
• নিয়ম ছিঁড়ে •


এমন নীল লবন পাখা পেলে
আমিও সামুদ্রিক সন্তরণে যাবো। 

মাঠ খোলা বুক পেতে সহজ মাটিতে 
জটিল শেকড় সন্ধি মেনে সরলবর্গীয় 
সাজাবো আবার বন বিলাসে। 

বিচ্ছিন্ন ডিঙা গুলির মনি কাঞ্চন বেলা শেষে ,
তীরে এসে দুলেদুলে খুলে দেবে চুলের অন্ধকার।

সারস শুভ্র নারীরা শঙ্খ বেদনায় 
বাজাবে  মঙ্গল কামনার শাঁখা, যাদের
স্বাতী সজ্জিত বিনুনি র ফাঁসে কত
উজ্জ্বল পুরুষ মেনে নিয়েছে শেকলের
কৃতদাস স্বাদ। মনে নিয়েছে মীন রাশি।

এমন অরূপ রতন 
আমি পাগলের প্রলাপ থেকে খুঁজে পেলে
সান বাঁধা গণিত ভেঙে দিঘিকে দেব ইচ্ছেমতি জল। 
  জল হবে বারোমাস নদীর শরীরে...
জাফরানী রঙের হরিণী 
এমন বয়স এলে তোকে মৃত্যু ভেঙে ছোঁবো। 

এমন নীল লবন পাখা পেলে 
আমিও সামুদ্রিক সন্তরণে যাবো

ছবি:- অর্ণব জানা
.................................…...................................





কবিতা

চিক বর্ষা সোঁদা টুপ পর্ব-১

রবীন বসু’র কবিতা-



১.

• বর্ষালিপি •


কোথাও বৃষ্টি পড়ছে

কোথাও কদম গাছ ভিজছে একা দাঁড়িয়ে।


গত জন্মের ওপার থেকে

ধূসর নিবিড়তায় ব্যথারা কান্না করছে

মেঘ-পৃথিবী জুড়ে নিদারুণ মেদুরতা

মানবীহৃদয় নিয়ে শ্রীরাধিকা হাঁটছেন

সিক্ত বসন থেকে টুপটাপ জল 

অলকাপুরীর দিকে চলে যায়

কানাইয়ের দেখা নেই

যমুনার পাড় ঘিরে শূন্য নূপুরের ধ্বনি

ছায়াচ্ছন্ন চরাচর বৃষ্টিবিগলিত পড়ে আছে।


আমাদের আক্রান্ত পৃথিবী

তবুও বর্ষালিপি লিখে রাখে মেঘেদের গায়ে…


২.

• শ্রাবণশ্লোক •


শ্রাবণের বৃষ্টিধারায় অক্ষরেরা ভিজে কাক।


আমার সমূহ বিষাদ জড়ো হল দরজায়

অভ্যন্তরে ঘন মেঘ, বজ্রগর্ভ অভিমান জমে

তুমুল কলহ নিয়ে দুইটি চড়ুই

রামগিরি পর্বতের দিকে ডানা মেলে দিল

ঘাড় নিচু করে কালিদাস বর্ষার শ্লোক লিখছেন।


হতভম্ভ আমি চেয়ে দেখি শ্রাবণ-সরস্বতী, এইমাত্র

ভিজেকাপড় থেকে যাবতীয় শ্লোক নিঙড়ে নিলেন।


৩.

• পুনরায় মেঘমল্লার •


বৃষ্টিবিঘ্নিত বেলা, জলস্তর উঠে আসে

আকুল উঠোন

মেঘমল্লার বাজেনি কোথাও…


বিষাদরাগিনী বাজছে মহল্লা মহল্লায় 

পাড়ায় পাড়ায়

অনিকেত ভয় নিয়ে ন্যুব্জ সময়ের ঘেরাটোপ

ওই দেখো শূন্য চেয়ে আছে

মাস্ক পরিহিত সুস্থতা কিছুটা দাঁড়িয়েছে ঠায়

অবিরল জলধারায় আরোগ্য ভাসছে

কাগজের নৌকো নিয়ে খেলছে না শিশু

যাপিত জীবনের চিত্রকল্প অদৃশ্য মিহিসুতোয়

কাটাকুটি খেলা…


হে সময়গ্রন্থি, উচাটন দূর করে পুনরায়

জীবনের মেঘমল্লার বাজাও আনন্দে!



ছবি:- মেহবুব গায়েন

......................................................................


কবিতা

চিক বর্ষা সোঁদা টুপ পর্ব-১

মাসুদুল হক এর কবিতা-


১.
• খুচরো যন্ত্রাংশ •


এখানে বাতাস ফসিল হয়ে 
কাঁচের মতো রোদে পুড়ছে 
কার্বন পোড়ানো দিন 
রাতের শরীরে মার্কারি 
বৃক্ষদের শ্বাস নিতে কষ্ট হয় 
কোথাও কোনো পাখি নেই 
 এখন যন্ত্রযুগ 
মানুষের শরীরে কিছু হলে 
বিপণী বিতানের তাক থেকে 
 খুচরো যন্ত্রাংশ বদলে নেয়া যায় 



২.
• মধ্যবিত্ত • 


সবুজ টিপ-পরা দিন 
ক্লান্ত মুখে অন্ধকারে ডুবে যায় 

তবুও ছাড়ে না মধ্যবিত্ত রক্ত 

সংসারের মুখ তিমির মতো 
গ্রাস করে ক্ষুধার জাহাজ 

তবুও স্বপ্নে উঠে আসে 
হলুদ সূর্য 
মেটার্নিটি সেন্টারে 
নীরবতা ভাঙে কচি শিশুর কণ্ঠ


৩.
• তোমার সৌন্দর্য •


তোমার সৌন্দর্য চুম্বকক্ষেত্রের 
মতো অভিকর্ষ বল

নতজানু প্রেম তোমাকে ঘিরে 
বিচূর্ণ লৌহমরিচার আবেগে 
সাদা কাগজের বুকে 
পড়ে থাকে এলোমেলো... 

দাহ ও দহনের ভেদ ভুলে 
তোমাকে ছুঁয়ে দেখবার মোহে 
ক্ষত নিয়ে শুয়ে পড়ে 
আরোগ্য নিকেতনের সফেদ চাদর

তোমার সৌন্দর্য চুম্বকক্ষেত্রের মতো 
আমাকে গ্রাস করছে 

লাবণ্যময়ী চাঁদের চকচকে 
রৌপ্যরশ্মী জ্বলে ওঠে 
তোমার বুকের সমুদ্রে জেগে ওঠা 
                                    নতুন চরে


ছবি- মেহবুব গায়েন
......................................................................

Sunday, 28 November 2021

কবিতা

পাকা পাতায় শিষ আলো-৩

রবিউল ইসলাম এর কবিতা-



১.

∆মুকুল ∆

 

বহু বছর ধরে

কঞ্চির ওড়নায় লেগে আছে একঘেয়েমি সুতোর অভাব।

 

পাশের ভাঁজে মাপ বেড়েছে

কুমড়ো –রসুনের অন্তর্গতসুখ

দরজার গুঁড়ি তেজপাতা পিচ্ছিল আবরণযুক্ত পুষ্প।

 

ঢোলালেবুর মতো উজাড় ঠোঁট এবং পিঠ।

 

পাঁচিলের নক্ষত্রে প্লাবিত হয় কব্জা

ছায়াগুলো উপযুক্ত কাঠামো

পাখির জীবন ঘাসে পেয়ে।



২.

∆ সেমাই ∆

 


অবশ্য –মানুষ মজুদ রাখে চেয়ার।

 

গোধূলির শাকপাতা ভাঙা শরীর

সাইকেল খাটুনি খাটে মাচা পোক্ত করার জন্য।

 

বাড়ির বিছানায় সোজাসুজি ঘোড়ার শ্লোক

হাওয়ারখরগোশ নাচে শীতনদীতে

সুকোমল টমেটোউরু জড়ীভূত ঐ বারান্দায়।

 

হাতুড়িস্বার্থ নোঙর ফেলে মাছ পদধ্বনিতে

কম্বলের কুয়াশায় ভিজে যায়

মুগডালের চুল।



৩.

∆ তালা-চাবি ∆

 


নিজের জায়গা ছেড়ে গেলাম ভাত –মাড়ের কাছে

জেনে নিতে পরিচয়।

 

অথচ

সে আমার থেকে দুঃখী

লকলকে দুঃখ তার

হৃদয়ের কানায় কানায় ভরে ওঠে গৃহস্থালি কাস্তে।

 

দারুণ ঘুম ভাসা ক্লান্তি।

 

মাটির ঝিক

চেলাকাঠের টক দই

দম নেওয়া লাটিম

বৃষ্টির তোলায় জ্বালে আলো।

 


৪.

∆ দুপুরের নূপুর ∆

 

কোনো বন্ধনে –চিরো বসন্ত থাকে না।




৫.

∆ উৎসবের ফুলদানি ∆


 

রাতের কলসিবোতাম

শিমপীড়ন বেয়ে নেমে আসে।

 

অন্ধকার বালির চাকা শহরে ঢুকে যায়

অলিগলি এবং চতুর্দিকে শূন্যফুলের আড়ৎ

সমস্ত গন্ধ বাদুড়ের খেপলা দুচোখের মতো।

 

ভীষণ

এ

পৃথিবী

বড়ই ছোটো এই বুকের তুলনায়।

 

জনপথ

দোকান

সুরের ধারা

ও পিচিয়ে রাখা ঝিনুক।






ছবি- মেহবুব গায়েন

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

কবিতা

পাকা পাতায় শিষ আলো-৩

বিশ্বজিৎ বাউনা’র কবিতা-



১.

∆  পাললিক কান্না ∆



নিরুত্তর পাখি থেকে গড়িয়ে পড়ছে খুব খুনী উর্বরতা...
আমার অক্ষরে অক্ষরে মেঘ-ভাঙা প্রবল জ্বরের হানা।
তাকে কোনোদিন কাছে বলতে না-পারা সে সৌখিন মৌনতা
এখন ডিঙি ছলাৎ থিতিয়ে জমায় পাললিক কান্না।

স্নায়ুর সখ্যতা আঁকড়ে বুঝি, অভিমান খুব বেসামাল;
প্রয়োজনীয় উপুড় আর লেখা নেই আদুরে ইনবক্স জুড়ে।
স্খলিত পাতার মতো অতীত এভাবেই কি তবে চিরকাল
বিশুদ্ধ হয়! শাব্দিক চিৎকারে অপূর্ণতা যায় পুড়ে পুড়ে...

কিছু কি ক্ষতি হয় সে সোনালী শস্যের সুখ উঠে এলে ঠোঁটে,
দু হাত জুড়ে কি এক অবাধ্য সমর্পণ আজো খেলা করে--
প্রেম কি ফিরবে বাদশা শাহরুখের কাঁচ ভাঙা আখরোটে?
আজ শুধু ফালি ফালি ফাল্গুন গুমরায় যে যার আড়াল ঘরে।

অপ্রাপ্তি চরকায় খুব, স্থির বুকে সব সামলাই নিরবধি,
বুঝি, উপেক্ষা এক পতন আর অপেক্ষাও আজ নয় ঔষধি।




২.

∆ ঔষধি বিষ ∆



আমন্ত্রিত যন্ত্রণা এখন আমার শূন্যঘরে
পালক খোঁজে না আর। বিরোধী হাওয়া দিকে দিকে---

আপেক্ষিক ওম নিয়ে এতদিন উড়েছিল যে ফড়িং
তার সহযোগী ডানায় সূর্যাস্তের শোক

ভাঙা-ভাঙা জমাট নষ্ট রঙ দিয়ে লিখে
ঊর্দ্ধক্রমে হলুদ শিখার প্রলেপ পেরিয়ে এখন চোখের কার্নিসে
চুপ। 

অপূরণীয় ক্ষতির পাশে
নত শীত-পোড়ানো খড়-ছাই...

এখন দু'বেলা শিকার-শূন্যতা খাবি খায় আত্মজ্বরে।

এই যে নিপুণ দহন, এর পাশে
আর দরকার নেই আগুনের ঝটপট

তুমি ঔষধি-বিষ
আজ স্বীকার করি অকপট।



৩.

∆  তথাকথিত আলো ∆



তথাকথিত আলোর ভিতরে ঢুকে দেখেছি এই আমি
ক্রমশ সুস্পষ্ট হতে থাকা বিড়ালের ওৎ আঁচড়।
থাবা থাবা সুখের বিপরীতে ক্ষুরধার নাব্যতায় আগামী...
হারিয়ে ফেলছি বটবীজের মতো স্বপ্নের সাজঘর।

এত যে অবহেলা, এত কাটাকুটি শিখেছি দু'বেলা তাও।
তোমার বুঁদ জুড়ে উড়ছে একরোখা বিকল্প দাগ।
দুরন্ত বিনয় দিয়ে আমার কলম ভেঙে কি পাও?
ভাঙা-ভাঙা সংলাপ ছুঁয়ে তুমি পাওনি টের সে বীতরাগ।

ফেরাই উষ্ণতা, পালক ব্যবচ্ছেদে জেগে সস্নেহ ঘাম।
দেখি, রোদ চলকে পড়ে যায় উঠতি ঘাসের আঙিনায়।
অপমান সামলে তবু মজ্জায় গেঁথে নিই ক্ষত আরাম, 
একাকী দুপুরে সরীসৃপ সুখে কে প্রজাপতি ছড়ায়?

সেতু নড়বড়ে, তবে পারাপার জেনে গেছে তার স্থির বিশ্বাস;
সাঁতার শিখি আর দেখি, দূরে উড়ে উড়ে যায় আলোর হাঁস।



৪.

∆  সন্ন্যাসী-ভস্মে ∆



কোন উচ্চারণের কাছে ঝুঁকে এসে আজ আমি
মাছরাঙা হবো? পাথর-গিন্নি খেলবো না আর।

ডিনামাইট স্পর্শ অতিক্রম করে গেছি আমি
শূন্যতার দিকে ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিগন্তের ডগায়
খসে পড়ছি কাক শুনশান আদিম কোটরে।

সত্যি ছিল না ঠিক যতটা ভেবেছি হৃদয়
অবুঝ ঈর্ষার ভিতর হাত পেতে তবু তোমাকে
সুগন্ধি শিলালিপিসম আঁকড়াই পূজনীয় মুগ্ধতায়

এই দোষ দেবত্বহীন

এই নভেম্বর ক্রমশ উধাও শিশিরের বিছানায়
কাঙ্ক্ষিত রোদের চকমকি ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়।

তবু কি এক আরোগ্য অদ্ভুত ছায়ার তাড়নায়
নিমরাজি আগামী এখন ফাঁসসম ভবিতব্য ভঙ্গিতে
লাজুক মজ্জা ফাটিয়ে সজোরে পুঁতে দেয় তুমূল অক্ষমতা।

তোমাকে আঁকড়াতে পারি না আর দাউদাউ,
শুধু নিরামিষ জলের শরীরে প্রাক্তন সাঁতার খুঁটে খুঁটে
নিভে যাই সন্ন্যাসী-ভস্মে।



৫.

∆  প্রদাহ ∆


কিভাবে দু'হাতে ভরে রাখি এত ধ্বংস, লুণ্ঠন, ভোগ আর মিথ্যাচার,
মানুষের কাছে আজ আর কোনো সহজিয়া পাখি নেই ভোরের আল্পনায়।
চলে গেছে পতঙ্গজীবনের স্বরলিপি, বিশুদ্ধ ছোবলের সহজাত দিন...
এই যে এত পরিকল্পিত ওৎ, দাম্ভিক প্রয়োগের দিবারাত্রি ক্ষমাহীন,
শীতের সোহাগে চিরহরিৎ ম্রিয়মান, ক্ষত লুকানো একপেশে মলিনতা,
এর কাছে কি হবে রেখে অমৃতের স্বর? বিশুদ্ধ কবিতার আর্তি?
ভঙ্গিল মগ্নতায় মানুষের মনে আজ আর ওড়ে না পড়শী ফড়িং,
কচিকাঁচা ঘাসের শিখায় শিশির-তৈরী আয়নায় ভাসে না প্রিয় মুখ।
জেরবার যন্ত্রণায় মানুষের ভিতর এখন সংক্রামক লোভের আলাদিন,
লাভক্ষতির পান্ডুলিপিতে আর ছায়া-সুন্দর নয় মেঘ-চেরা স্বপ্নিল বক।
আমাদের ঘুমের ভিতর হৃদপিন্ডে আর গড়ায় না সেই কাঙ্ক্ষিত
প্রথম বর্ষার জল-ছোঁয়া ধানবীজের অঙ্কুরিত ফসলের প্রবাহ;
পরিবর্তে রাখা আছে বিজ্ঞানসুলভ বিষ, গতিঋণ, সৌখিন টোপ:
ভালোবাসার কাছে সব ভালোবাসা হেরে হয়ে আছে প্রদাহ।




অলংকরণ - এনা 
০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

কবিতা

পাকা পাতায় শিষ আলো-৩

সব্যসাচী মজুমদার এর কবিতা-






১.


∆ কুলুঙ্গি ∆



যে কুলুঙ্গির মোহ ছাড়িনি কোন‌ওদিন
এখনও রয়ে গেছে আবির ও পুরনো পেরেক গুচ্ছ তাতে
প্রত্যেকটা ছবির সঙ্গে জুড়ে থাকে এই কুলুঙ্গিরা

মনে আছে অইখানে চিঠি রেখে হারিয়েছিলেন ভরে পাওয়া লোক
কুলুঙ্গির মোহ ছাড়িনি কখনও

কুলুঙ্গির তলা থেকে
তাকিয়ে রয়েছে ঝিঁঝিঁ
                         আকাশে অনেক তারা
তখন‌ই মনে পড়ে প্রতিটা সহজে ছিল
                                দাম্পত্য ঈশারা...




২.

∆ সারাদিন ∆



সারাদিন‌ এসে কৃকলাশ ছুঁয়ে যায়
আমি ফিরি জলে জল ফেরে বর্ষায়
একা হয়ে যাওয়া বাড়িটার স্তনে মৃদু
হাত দিয়ে বোঝে ডিসটোপিয়ান ঋতু

ভাত মাখবার আলো মিশে যায় ধানে
একা হয়ে যাই দহলিজ সন্ধানে
ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ি আর ত্রাসে
শিশু হাত ভাসে দেখি যোনি পথ ভাসে

পরোজে লেগেছে বিহ্বলতর স্তন
না খেয়ে মরার যতটুকু সঙ্গম---
রং হয়ে যায় ভ্রণলিপিটির মতো
এ জীবন বোঝে অবলোকিতের ক্ষত!



৩.


∆ জনম জনম ∆



জনম জনম জলে ছাই পড়ে আছে
আর বায়ুস্তরে ঘটে ইস্কাবন
তারপর থেকে এ শ্রাবণ বিবলিকে 
 কখন‌ও লিখিনি ইস্তেহার

কেন লিখিনি তা
ভেসে যাওয়া মাছের প্লাস্টিক আর জানে রহস্যের মিথ

আমার এই বরষা ধারনায়
             যুগে যুগে সামান্য‌ই ঘটেছে লিলিথ



৪.


∆ মাশরুম ∆



এই ভেপে ওঠা বাড়িঘর
এই বৃষ্টি মিথ ও নিষ্কম্প ভোর
                     কেবল সন্তান চায়

অনাদি অনন্ত পুত্র কন্যা চাইতে চাইতে
একজন বাঙালি কবি হয়ে যায়

যার ছিন্ন শিরে ঝিঁ ঝিঁ বসে আছে
ইতস্তত জোনাকি ভেসে যায়...



৫.

∆ অরণ্য ঢেউ ∆



আমাদের অরণ্য ঢেউ আমাদের চুম্বনেরা
রজঃ দোষ করেই থাকে।যতদূর সিজদা ঘেরা
দুজনেই হাঁটতে গেলে আঁচড়ায় চড়াই পাখি
লিঙ্গের‌ও অপার্থিবে তামসের মতন থাকি

তবে কী পাল্টাবে না আমাদের প্রামাণ্যসুখ!
আরে এই প্রপঞ্চময় আমরাই গুগলি শামুক।
হাঁসে খায়।দৈব জনেও।জলে যাই অসাবধানে।
ও মায়ের বাঙালভূমা,যোনিহীন শিশুর কানে
বলে দাও এই ছায়ানট আমাদের মৌল দাবি
আয়াতে মানুষ একা... কোরাসে পদ্মনাভি

আমাদের অনন্য তাপ আমাদের দেশ মুসাফির
আমাদের সায়ান্হকাল আমাদের জয় রঘুবীর
সব‌ই এক জীঘাংসাধ্বক সব‌ই এক মীরার ভজন
আমাদের রেশন কালে ধাঙড় এই আমরা ক'জন




ছবি- মেহবুব গায়েন

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

Tuesday, 16 November 2021

কবিতা

পাকা পাতায় শিষ আলো-২

সুপম রায় এর কবিতা-




১।

∆ খাদ ∆



ছায়া বাঁধার আগেই নিভে আসে আলো।
পাহাড়ি মেঘের পারে 
রেলিং ধরে যে মেয়েটি খাদের দিকে
তাকিয়ে থাকে অপেক্ষায়;
আমার সাথে সেই মেয়েটির আলাপ নেই।
ছোটবেলায় এক শনিবার স্কুলের দেওয়াল টপকে ছাদে উঠেছিলাম,
ছাদ থেকে দূরের পাহাড় দেখা যেত 
   যেন আমার কাঁধ সমান উচ্চতা তার।
সেইবার প্রথম শুনেছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘার কথা ---
জেনেছিলাম, এমন উঁচু পাহাড়েও নাকি মানুষ চড়ে।
জানি না, সেই দিন এমনভাবে রেলিংয়ের ধারে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল কিনা।

একটা বাঁশির শব্দ আসছে কোত্থেকে...
আজ পাহাড় চড়তে চড়তে বুঝতে পারছি -
ছোটবেলা, পাহাড়, আমি আর সেই মেয়েটির মাঝে
একটা কালো বড় খাদ রয়েছে।




২।

∆ বদ্ধহীন ∆



সম্পূর্ণ দেহকে শেষ অধ্যায়ের কিনারায় পৌঁছে যেতে দেখেছি।
দু’হাতে আগুন-পদ্ম, 
দু’চোখে তুলসী, 
নাকে তুলো,
হৃদকম্প বন্ধ।
এমন এক ডাকের ভালোবাসায় কে আর অমন সাড়া দেবে!
মাটিতে ফুলবীজ পুঁতে দিলে
সেও একসময় বড় হয়ে গন্ধ ছড়ায়।
এ-তালার কোনও চাবি নেই কিংবা এ-চাবির কোনও তালা নেই।
দেখছি, হারিকেন জ্বালিয়ে সে মিশে যাচ্ছে মাঝ-আকাশে;
আর আমার বেরসিক স্বপ্নে 
কোনও রকম ক্ষতের দাগ থাকছে না। 
সীমাবদ্ধে কিছুই নেই
শুধু মোহ ছাড়া।



৩।

∆ যে তারা নিষিদ্ধ ∆



নিষিদ্ধপল্লীর সেই তারাটা আজ কয়েক মুহূর্তের জন্য এসেছিল আকাশে ---
মরে যাওয়ার একরাশ সম্ভাবনার কথা জানাল আমাকে।
আমি যতবারই জীবনের কথা বলি, বাঁচার কথা বলি -
সে তার একেকটা শিরা ছিঁড়ে ফেলে শরীরের। 
আর যখনই মৃত্যুর কথা বলি,
দেখি সে তৃপ্তি পায় খুব। 

তাকে আরও বেশি বেশি মৃত্যুর কথা বলে থামিয়ে দিলাম আজ।
বললামঃ থাক আর নয়, একটা শিরা অন্তত থাক।
শরীরের শেষ শিরাটা ছেঁড়ার আগে যদি কখনও তোমার বাঁচার ইচ্ছে জাগে!

তারাটা হঠাৎ নিভে গেল।




৪।

∆ সর্বনাম ∆



কেবলই সর্বনামের বিশেষ্য আর বিশেষণ খুঁজে চলেছি ...

মরীচিকার প্রান্তগুলো 
            কখনও কখনও তীব্র ধারালো মনে হয় ।
আমি নাগরিক আগন্তুক ধ্রুব-গ্রহের, 
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কলোনির গলিতে পথ হারিয়েছি ।

পিছন থেকে যারা যারা আমায় ডাকে
তারা আমার নাম জানে না ---
আমি সর্বনামের বিশেষ্য আর বিশেষণ খুঁজে চলেছি ।

ফিরে এলে
যদি পারো অস্বীকার করো আমায়,
আমি নতুন নামের হার মেনে নিতে শিখেছি ।





৫।

∆ আক্রান্তকারী ∆




কবিতা লিখতে লিখতেই শব্দাক্রান্ত হয়ে পড়ছে কবি।
তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠছে পাহাড়, নদী, তারা।
সে তাঁর অক্ষর থেকে শব্দ, শব্দ থেকে বাক্যে 
ছড়িয়ে দিচ্ছে মোহ-ঘ্রাণ,
বিস্তৃত করছে ছায়া কবিতার মহাকাশে।

সেই কবিতা পড়তে পড়তেই 
পাঠক দেখে নিচ্ছে ভবিষ্যৎ-বর্তমান, প্রাকাতীত কাল;
এমন কি মোহ থেকেই প্রেমে পড়ে যাচ্ছে 
                           কবি এবং কবিতার।
এখন আক্রান্ত হচ্ছে পাঠক নিজেও,
নতজানু হয়ে বসে পড়ছে কবির কবিতার সামনে ---
এবং তার চোখ আর মুখে 
                          তৃপ্তির তারা জ্বলজ্বল করছে।
মন ও স্বপ্নে স্পষ্ট হয়ে উঠছে কবির মুখ।



অলংকরণ-  এনা

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০