Saturday, 19 April 2025

কবিতা

আঁচলডোবা জল পর্ব -২

কনিষ্ক শাসমল এর কবিতা -



[] প্রেমিকা ও ছায়া

আমার যে ভাইটি আত্মহত্যা করল গত পাঁচ দিন আগে
আমি দেখতে পাই না তার মাথার মধ্যে জ্বলে ওঠা নক্ষত্রের সুর। 
মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো বুকে কোন পাখির শুধু ডানা ঝাপটানো ? 

কী রঙের পোশাক পরে বোহেমিয়ান আলোয় হাত বাড়াচ্ছে ! 

হাতের তালু থেকে আজ ভেসে আসছে রূপনারায়ণের জল,
আলগা পাড়ের কুয়াশা ঢেউ, অভিমান
আমাদের সবার চোখ নীল হয়ে আসছে তার ঠোঁটের মতো । 
ঘন নীল

তার প্রেমিকার অমাবস্যা ছায়ায় আমাদের বাড়ির উঠান চিরকালীন একাদশী রোগ। রোগাচ্ছন্ন অবস্থায়।



[] অলক্ষ্মী


তীক্ষ্ণ পেটের যন্ত্রনা থেকে যখন খসে পড়ছে নক্ষত্র 
বাবার পায়ের কাছে
তখন আমাদের ভাতের হাঁড়িতে সন্ধ্যা
মায়ের একাদশী। 

এই বিদ্যুৎ সংযোগহীন গ্ৰামে কখনো লোডশেডিংএর ভয় হয় না। 

মৃত বালকের বুকের মাপ চওড়া হচ্ছে
সরস্বতী ধূপের গন্ধে
আর
এপাড়া ওপাড়া সব লক্ষ্মীর ডালাতে তিল ছড়িয়ে দিচ্ছে গর্ভপাতের ভারসাম্য। 


[] প্রজাপতি রঙের মাঠ


গভীরে কিছু নিদ্রাহীন রাত জন্ম নিচ্ছে
প্রজাপতি রঙের মাঠে শাড়ি খুলে দিয়েছ রোজ। 

তোমার জাতক হাওয়ার গহীন লাগা স্মৃতি
শিমুল তুলোর মতো উড়ে যাচ্ছে

কানকো কাটা কই মাছ রঙের আকাশ
মাথার উপর অংশত মেঘলা। 



অলংকরণ - কনিষ্ক শাসমল 
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••

Friday, 18 April 2025

কবিতা

আঁচলডোবা জল পর্ব -২

অনন্যা মান্না’র কবিতা -


[] নিপাতনে সিদ্ধ 

সেইবারের সামুদ্রিক বাতাসে ভাসছিল সুবাসিত মৈথুন!
অজস্র ডান হাতে লেপটে থাকা কাজলা অভিযোগ।
বুকের দু-তিনটে খোলা বোতামকে ঘিরেই মাঙ্গলিক সভ্যতা!
শূন্যতার প্রতি-'শব্দ' শুনতে শুনতে কখন হাঁটুজল হয়ে গেছে সান্দ্রতা!
এই অবৈধ শীৎকারগুলো মন দিয়ে শুনি; তারপর 'আভোগ'-এ টানি একটা স্বস্তিদায়ক পূর্ণচ্ছেদ।
এসব 'নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি' ছাড়া কলম অসহায়!



[] যা মৌখিক নয় 
 
এখানে পূর্বাপর লিখে চলেছি অহেতুক প্রয়োজনীয়তা! 
এই যে তোমাদের কথা বলতে চাইছি রগরগে শব্দে; যেখানে নিঃশ্বাসে ঘেমে ওঠে ঘর,পড়ে থাকে আলুলায়িত অবশেষ; যেখানে বিরূৎ দুটি হৃদযন্ত্র জলের মতোই সহজ অথচ মারমুখী-এই সেই শব্দহীন সারাংশ। 
যে কয়টা সাদা পৃষ্ঠা সংস্কারহীন; সেখানে দিন দিন সমরাস্ত্রগুলো নিরুপায় হয়ে পড়ছে নিষ্ঠুর এক সূর্যাস্ত আইনে!
প্রয়োজনে আরো মুখচোরা হব,রাত্রি জাগার আগে জাগবো ভাঙাচোরা জানালায়;মিশবো জীবাণু সংক্রমিত ভাতের থালায়; শুনব জীবনধ্বনি- যা মৌখিক নয় অথচ কর্নগোচর!


[] স্পর্শ ও মৃত্যু 

অকাট্য অন্ধকারের তলদেশ থেকে উঠে আসে দৈনিক শব্দালঙ্কার! 
আমি নিরপেক্ষ নই;কিন্তু বিকলাঙ্গ নিরক্ষরেখার মতো বসে থাকি দুই গোলার্ধের মাঝে; বারোমাসই বন্ধ রাখি কাচের জানালা।
কিন্তু মুশকিল হল-রোদ আর শব্দ দিয়ে লিখি উনিশ শতক;কবিতার কালাশৌচের পর ঘর সাজাই নববর্ষের আশ্লেষে,
এতবার মৃত্যুর পরেও আমার জীবন যেন পুনর্ভব!
অজস্র আণুবীক্ষণিক অতিথি কড়া নাড়ছে জানালার ওপারে; ব্যর্থতায় কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তাদের সনেটীয় কান্না!


অলংকরণ - কনিষ্ক শাসমল 
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••



Thursday, 17 April 2025

কবিতা

আঁচলডোবা জল পর্ব -২

বিশ্বজিৎ বাউনা’র কবিতা -


[] সীমায়িত ১

এত অস্বীকার নিয়ে কাকের ডগায় পড়ে থাকি আমি!
বৈঁচি ফলের মতো রোদ তফাৎ নিয়ে আজ দাঁড়িয়েছে 
আমিষ স্খলনের এই ঋতু নিজস্ব আম্লিক --

সেই আদরের স্থিতি এখন হলুদ
তবু তোমাকে কামনা করি পলাতক শরীরে নেমে
আজ অক্ষরে অক্ষরে বালির উঁকি 

সাধ্যের অতীত আজ এই শোক
আমাকে তুমুল খসায়
             মৃত বাতাসে ঠুকে ঠুকে 

সে নির্বাচন রীতির সীমায়িত প্রহর।


[] সীমায়িত ২

কে আজ বুঝেছে ডিঙির গোপন নাভিতে খরাস্নান আছে?

এখানে নাবিকের হাতল বর্ণিত প্রশ্বাস ছুঁয়ে 
দূরের ছায়া থেকে চিরন্তন পাখির হিম ভেঙে আসে
যেন অলৌকিক প্রদীপের প্রভা!

দুর্বহ এই অন্ধকার নীল হয়ে যায় ঠোঁটে...

আহত প্রেষণায় ডুবে ডুবে 
প্রকট অশ্রু থেকে পাথরের দূরত্বে তবু বৈঠা টানি---


[] সীমায়িত ৩

সে অস্বচ্ছ চোখের ঘাস ছুঁয়ে ঘাসুড়ে চাঁদ হাসে

লাঙল ফেলে রেখে কৃষক চলে গেছে আয়ুর সমীপে
সমস্ত কীটের উল্লাস অতিক্রমকারী 

কেঁচো বনসাই আড়ি আজ
মনোভূমি জুড়ে অসাড় পালকের জৈব সংসারে 
সারা সন্ধ্যা নেতিয়ে পড়ে থাকে।

আচ্ছন্ন জোনাকি মুকুলিত হয়েছে ফের

মোহ এক আশ্চর্য ঔষধি --- আমার অমনোনীত মুখে 
ইতস্তত নক্ষত্রের ফুরিয়ে যাওয়া শস্য শুকায় বিনীত ঈর্ষায়।



অলংকরণ - কনিষ্ক শাসমল 
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••

Sunday, 13 April 2025

কবিতা

আঁচলডোবা জল পর্ব -১

সৌমাল্য গরাই‌ এর কবিতা -

[] জননী 

আমাকে পুরোটা গিলে নেবার পর
শাদা কাপড়ে ঢেকে বলা হয়েছিল- ভালো হবে
শূন্যে ছোঁড়া দু একটা ফায়ারিং, 
ছুটে এসে হাতকড়া পরিয়েছিল চলমানতায়
ফাটকের ভঙ্গুর রেখাতে লেখা ছিল তোমাকে খোঁজার সংকেত
পকেটে খুচরো নোটের ছাপ, দু এক গাছি লম্বা চুল
চিরুনির কাছে তল্লাশি হয়ে ঝুঁকেছিল
শুকনো গালে নরম অমসৃণ হাসি, নির্বান্ধব কান্নায়
তোমাকে দেখা গিয়েছিল বোরখার আড়ালে, চরম ব্যস্ততায় 
জীবিত ও মৃত, দুই সন্তান লালন-পালনে

[] সংসার 

ঝড় আসে, কত মৃত্যু হয়ে গেছ পার... 

সন্ধ্যা নামে, শাঁখের আওয়াজ শুনে দূর—
আকাশে যখনি জ্বেলে দাও লক্ষ তারা
সবার অলক্ষ্যে ভাবি, এভাবে অনন্তকাল 
চলে যাবে, দুজনের নতুন সংসার..


[] শিখণ্ডী 

পোড়া জতুগৃহের নিকটে   জমে থাকা ছাই
তুলে আনে দায়ভার, মহাযজ্ঞশালার বিজনে
খেলাকে ঘুরিয়ে দিয়ে শকুনির পাশা শুধু জানে
 কত দানে কার স্মৃতি কতটা পোড়াবে 

নিয়ম পতিত  হয়।  অদ্বিতীয় একলব্যের কর্তিত 
বৃদ্ধাঙ্গুলি উৎসর্গ পেরোয় সামাজিক কসাইখানায়
 অযথা নিরীহ  বালকের শোণিত যাত্রায়
ভিজে যায় স্থল জল অন্তরীক্ষমূল
উদবাস্তু পথিকের ভিড় কমাতে আগুন গোগ্রাসে
গিলে নেয় খান্ডবের বন

শেষ অন্ত্যমিলে পাওয়া প্রারব্ধ হিসেব
ধ্বংসের আওয়াজ আনে, অর্জুনের  স্মৃতিবিদ্ধ তীরে
ভীষ্মের অমেয় প্রতিজ্ঞার ফাঁকে-ফাঁকে
 ভুয়ো দায়-দায়িত্বের প্রগাঢ় গান্ডীব হাতে নিয়ে
 শিখণ্ডী দাঁড়িয়ে আছে লিঙ্গহীন অপত্য জগতে


অলংকরণ - কনিষ্ক শাসমল 
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••


Saturday, 12 April 2025

কবিতা

আঁচলডোবা জল পর্ব -১

শুভ্রাশ্রী‌ মাইতি'র কবিতা -


[] শুশ্রূষা

বুকের ভেতর গোপনে, খুব গোপনে
বয়ে যায় এক ছলাৎছল নদী

দুঃখ বাড়লে, তার পাশে এসে বসি
নির্জন বিকেলে ঘুঘু ডাকে, ডাকে
রূপসী বাংলার মাঠঘাটঝিঁঝিঁ
বর্ণমালার বিশুদ্ধ আবহ যেন

জলের ক্ষয় গোপনে নামিয়ে রাখি
সে আমাকে ঢেউ, স্রোত, নৌকা দেয় 
পালতোলা জাহাজ, গলে যাওয়া
খড়ের প্রতিমার ভেজা ভেজা আশিস

মনে মনে তাকেই আমি
বাংলা ভাষা বলে জানি


[] সেলাই

পড়ন্ত ছায়ার কাছে
অনিঃশেষ দাঁড়িয়ে থাকি

সে আমাদের দুঃখের গল্প শোনায় রাতদিন
আমাদের আলো আর অপ্রতুল আগুন,
আমাদের পাতাখসার বিষণ্ণ, করুণ কাহিনী

ভাবছি, সুখের গল্প শোনাতে বলব 
তাকে এবার; এক উষ্ণ সোয়েটারের 
আশ্চর্য বুনে ওঠা...সোজা, উল্টো,
উল্টো, সোজা...ঘর ফেলা, তোলাতুলি

দেখতে দেখতে শীতের পালক
ঝরে যাবে আমাদের; রোদ্দুরে
ভরে যাবে পরিযায়ী জন্মের পাতাগুলি


[] শবরী

যদি দাঁড়াতে হয়, 
এইখানে দাঁড়াবো খানিক...

এই মরা নদীর সোঁতা
রুপোর কাঁটা বাঁক শিয়রে
ধানগমের আলো; সাঁকোজীবন;
আবহমান... ভাঙাচোরা, নড়বড়ে

এইখানে, ঠিক এইখানে 
বহুজন্ম ধরে দাঁড়িয়ে থাকব আমি...
যদি নেমে আসো হড়পা বানে তুমি
ভাসিয়ে দাও সমস্ত অভিমান, নুড়িপাথরে


হাতের পাতায় এ ডুবন্ত আকাশ, 
বৃষ্টিরেখ জানালা, ঝিঁঝিগানের 
সরগম স্বাক্ষী; অপেক্ষায় আছি...
জোছনার মালাচন্দন নিয়ে
অন্তহীন অপেক্ষায় আছি


অলংকরণ - কনিষ্ক‌ শাসমল‌ 
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••


Friday, 11 April 2025

কবিতা

আঁচলডোবা জল পর্ব -১

∆ দিশারী মুখোপাধ্যায় এর কবিতা -

[] বিপন্ন প্রেম 

তোমার সঙ্গে অনেক কথা ছিল , বলা হল না ,
কাছে যাবার রাস্তা পাচ্ছি না ;
টেলিফোনের টাওয়ারও সক্ষম নয় ।

কয়েকটা সুন্দর সুন্দর জামা বেছে রেখেছিলাম 
তোমার কাছে যাবার সময় পরব বলে ,
যাওয়া হল না ,
পরা হল না ।
রাস্তাগুলো মাঝে মাঝে কাচের পুতুলের মতো ভেঙে গেছে ।
ভাঙা রাস্তাগুলোর মাঝে মাঝে 
মৃত ও ধর্ষিত বিশ্বাসের শব পড়ে আছে ।

যে সব কথা বলা হল না , যেগুলোকে এতদিন 
সুন্দর ও পবিত্র মনে হতো ,
আমার নিজের সেই কথাগুলোকেই এখন ফাঁদ বলে মনে হচ্ছে ;
ধারালো ছুড়ির মতো তাদের রূপ।

ঘরে ফিরে আসি ।
হ্যাঙারে ঝুলন্ত সুন্দর জামাগুলোকে এখন 
প্রতারকের পাসপোর্ট বলে মনে হয়।


 [] বাগানের বাইরে থেকে 

ভেবো না, না-ডাকলেও ,গেট খুলে বাগানে ঢুকব ,
দরজায় কলিংবেল আছে বলেই তা বাজাব।

তোমার ঘরের করিডরের নৈঋতকোণে একটি পামগাছের পাশে 
বিষণ্ণ মনে বসে আছে ভায়োলিনটি ,
আমি গিয়ে যদি তাকে একটু স্পর্শ করি 
একটা হাল্কা সবুজ রঙের উষ্ণ আলো জ্বলে উঠবে তার চোখে ;
কিন্তু সংবিধান অমান্য করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
সে একদিন আমার কাছে পরামর্শ চাইবে , - এই বিশ্বাসকে 
রোপণ করে চলেছি অবিরাম।

ডাকোনি বলে ভেতরে ঢুকিনি ,
ঢুকিনি বলে চোখে দেখিনি , হাতে স্পর্শ করিনি ,
কণ্ঠে ধারণ করিনি ঈর্ষার কামড়।

গেটের বাইরে দাঁড়িয়েও আমি দেখতে পেয়েছি সবুজ গর্ভাশয় ,
দুহাতে মেখে তৈরি করেছি প্রতিমার মাটি ,
তোমার বিষদাঁতের ওষ্ঠে দিয়েছি চুম্বনের মধু।

ঠিক এই মুহূর্তেই একডজন শাড়ি উড়ে যাচ্ছে আকাশে ,
একটু পুরনো ভাষায় যাকে বলে বলাকা।



[] মধ্যপদলোপী 

এই মধ্যবর্তী সময়ে যে লেখাগুলো শরীরী ভাষা পেল না 
তারা এখন কোথায় রয়েছে খুঁজে পাব না।

যেসব নিরাকার যন্ত্রণা আমার দৈহিক যন্ত্রণাগুলোকে লঘু করছিল 
তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে গেছে একটি মেয়ে ।
তার অকুতোভয় শরীরের মধ্যে পারমাণবিক আকার পেয়েছে 
ওদের তীব্রতার মিনারগুলো।

আমার হারিয়ে যাওয়া কবিতাগুলোকে আমি 
তার কাছেই যেতে বলেছি এখন ,
সে তাদের অভয় মন্ত্র দিয়ে আবার ফেরৎ দেবে আমাকে।

এই মধ্যবর্তী সময়টুকুর বিবরণ 
তোমরা ইতিহাসের মধ্যে রেখো না ,
পুড়ে ছাই হয়ে যাবে ইতিহাস।


অলংকরণ- কনিষ্ক‌ শাসমল‌ 
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••