Saturday, 10 October 2020

কবিতা

মাটি খোসা পর্ব-২

কবি উত্তম দত্ত এর কবিতা-




১।।  ∆ সন্ন্যাসিনীকে ∆



আমি বিশ্বাস করতাম, কৃষ্ণসাগর থেকে উঠে এসে অন্যমনস্ক আত্মারা একদিন খুঁজে নেবে তোমার কবিতা। সমুদ্রের দেবতারা উচ্চকণ্ঠে পাঠ করবে তোমার নিটোল অক্ষরবৃত্ত। আশ্রম থেকে উঠে এসে তোমার মাথায় হাত রাখবেন মধ্যযুগের স্বপ্নের কবিরা। ঈর্ষায় পুড়ে যাওয়া মানুষের চোখের পাতায়   ঈশ্বর-প্রতিম এক কবি লিখে রাখবেন সোনালি সংলাপ। অলৌকিক আলোয় সহসা ভরে উঠবে তোমার সব-হারানো ধুলোর আঁচল।

আমি জানতাম, মোহনায় পৌঁছোবার আগে তোমাকে পেরিয়ে যেতে হবে অগণন পিশাচের কালো হাতছানি, অসূয়ার মায়াজাল, অক্ষমের গোপন প্রস্তাব। নৈরাশ্যের জরাগ্রস্ত মেঘ ও কুয়াশা তোমাকে বিষণ্ণ করবে ভোরবেলা। শুধু কবিতার জন্য এইসব মৃত্যুস্নান দুপায়ে মাড়িয়ে যাবে তুমি।

তোমার শৈশব দেখেছি আমি, টলোমলো পায়ে অক্ষরের হেঁটে যাওয়া, কাঁচা হাতে প্রতিমা বানানো। তথাপি মাথায় রেখেছি ছায়া, স্নেহময় হাতের আঙুল। নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, একদিন ভুবন পেরিয়ে যাবে তুমি। একদিন আমাকেও ভুলে যাবে, যেভাবে সন্ন্যাসিনী ভুলে যায় ফেলে আসা জরাজীর্ণ গার্হস্থ্য আশ্রমের কথা।





২।।  ∆ 'ছিদ্র না পাইলে শনি প্রবেশ করে না' ∆



ফিরিয়ে দিয়েছ, তাই
এবছর কোনও ফসল হলো না 
আমাদের নাবাল জমিতে। 
উড়ুক্কু সাপেরা এসে নষ্ট করে দিয়ে গেছে
রূপবতী হাঁসের খামার।

মাঝরাতে উঠে জেলেপাড়ার বিধবা বউটি 
ঘুমন্ত তোর্ষার জলে ছুঁড়ে দিয়ে এলো 
গামলা-ভরতি ফলিডল। তার রমণের কাল
ধুয়ে নিয়ে চলে গেছে এই নদী।

উৎসব-বাড়িতে গিয়ে আচমকা বেডকভার তুলে
আমিও দেখেছি জরাগ্রস্ত তোশকের মরা অট্টহাসি ।
প্রেসক্লাবে সাংবাদিক ডেকে আমিও বলেছি :
বিশ্বসুন্দরীর দাঁতে কীভাবে লুকিয়ে থাকে ঘুণপোকা। 

ফিরিয়ে দিয়েছ বলে, এই মৃত মফসসলে 
কবিরা মদ খাচ্ছে দুবেলা।
প্রকাশ্য রাস্তায় দিন-দুপুরে হস্তমৈথুন করছে
পাথরে মাথা কুটছে লুনাটিক ভিখিরির মতো
আর ক্রমাগত ভুল ছন্দে পদ্য লিখে ছুঁড়ে দিচ্ছে
পরিত্যক্ত ফসলের মাঠে।




৩।। ∆ প্রেত ও পিশাচের উপাখ্যান ∆



দুচোখে পেরেক গেঁথে 
চলে গেছ বলে 
তুমিও ভেবেছ অন্ধ হয়ে গেছি আমি।
ভেঙে পড়া প্রাসাদের ছাদে
মৃত প্রহরীর বন্দুকের পাশে
আর কোনো প্রেত জেগে নেই।

মানুষ মেরেছ তুমি --- 
মানুষের রক্তে ভেজা হাতে পাখিরাও ভোরবেলা 
গম খেতে আসে না এখন।
সারাটা বছর একটিও বৃক্ষ রোপণ করোনি তুমি। 
মনে রাখবার মতো একটিও অক্ষর
লিখেছ কি মানুষের চোখের পাতায়?
সারাদিন শুধু মহুয়ার চার ফেলে বসে আছ ব্যক্তিগত দিঘির কিনারে।

যেভাবে প্রত্যেক শিশু অসতর্ক অন্ধকারে একদিন বাবা ও মায়ের অলৌকিক সঙ্গমদৃশ্য দেখে ফেলে সারাদিন অস্বস্তিতে মরে, সেইভাবে 
একটা বোবা কালা তাঁবুর ভিতরে একা একা 
ঘুরে মরছি আমি। 
যেন কিছুই দেখিনি, কিছুই শুনিনি।

কিন্তু যতই আড়াল করো, একদিন তোমাদের অনাচারী সঙ্গম-দৃশ্য দেখে ফেলবে 
কাঞ্চন-বিলের পাখিরা। 
এবং কিছুই না দেখার ভান করে তারা 
পদ্মপাতার উপরে মাছ রেখে উদাসীন ঠোঁটে সারাদিন ঠুকরে ঠুকরে খাবে। 
আর তুমিও সমস্ত দিন কেউ কিছু দেখছে না ভেবে
ছোটো ছোটো পিশাচের হাত ধরে 
অন্ধকারে জাহান্নামে যাবে।

এই পাখিজন্ম আর ভালো লাগছে না বিনোদিনী।
এই নষ্ট স্টেথোস্কোপের গল্প আর ভালো লাগছে না। এই মৃত জিরাফের ভাষা 
এই দিন আনি দিন খাই ---- ঘন্টার জীবন 
ভালো লাগছে না আর।

ছোটোবেলায় যে বাগদি ছেলেটি 
আমাদের গরু চরাত 
আর খড়িনদীর জলে 
উড়ন্ত পাখির ছায়া দেখে দুহাতে মৈথুন করত
তোমার নতুন বন্ধুটির মুখ অবিকল তার মতো।

এইসব শ্যাম্পু করা রাখাল-বালকদের 
সস্তা আন্ডারওয়্যারের গল্প শুনতে 
আমার আর ভালো লাগছে না।




অলংকরণ- অতীশ কুণ্ডু

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°



Thursday, 1 October 2020

কবিতা

মাটি খোসা পর্ব-১


কবি মেহবুব গায়েন এর কবিতা-




১।।   ∆ নামিয়ে রাখা জীবন ∆



তোমাকে দেওয়া অনেক গুলো বছর মনে আছে চারদেয়াল
যেদিন তোমার মুখ থেকে জীবন নামিয়ে রাখা হলো
আমি দূরে অনেক দিনের ভেজা কাপড় শুকিয়ে নিচ্ছিলাম মধ্য শিবপুর গ্রামে ,
তোমার রং চটা তুলির নজরুলে আমাকে রেখে
ফিরে গেলে....





২।।  ∆ সাদা সাইকেল ∆


আয়না পাতার আঁচে আমি ও জীবন
চা-বিস্কুট 
সাদা সাইকেলে চলে যাচ্ছে সংসার
সঙ্গে আগুন মা 
আমি দগ্ধ দিন....




৩।।  ∆ আলোর ওপারে ∆



ফ্যানের রাজত্ব পেরিয়ে
আমি হাত পাখার বিনুনিতে
 লাল মেয়ে খুঁজি,
খুঁজি ছাপ মুখ
মুখস্থ করা পলাশ নাচ,
খোঁপ কাটা পাহাড়ি মহুল আমাকে ডাকে
স্বপ্ন সেতার জড়িয়ে রাখি আলোর ওপারে...




৪।।   ∆ চন্দন ছন্দ ∆



তীর ছোঁড়া তুমিও পারতে
নেমপ্লেট মুখে টেনে বসাতে
শেষের খেলা
ছক্কা-চার-এক
বাউন্ডুলে আখড়া পার করলে বিনু
হরিলুটে কুড়াই নদী চৈতন্য
চন্দনে ছন্দ পোড়াও বাঁশির রাজকুমার...




৫।।   ∆ স্লেটের রঙ ∆



অযথা আকাশের দিকে শূন্য তাকালে 
মধ্যবলয়ের ভেতর দিয়ে মঞ্চ
নাটক চলছে,
একে অপরকে চেনানোর অভিনয়
রঙ ফুরায় মাটি স্লেট মুখোশ,
বারবার মুছেছি
চিনে রাখা অনেক কিছু
বন্ধু-সভ্যতা-রাস্তা
যেখানে শুরুর শব্দ ভাষ্য 
ছড়িয়ে দিচ্ছে ছবি

একের পর এক নেগেটিভ
ভাষা নয় আমিতো অপুকে খুঁজে নিচ্ছি
                                             কবিতায়...




অলংকরণ - অঞ্জন দাস

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°


কবিতা

মাটি খোসা পর্ব-১

কবি সতীন্দ্র অধিকারী’র কবিতা-





১।।  ∆ অন্য ভাত অন্য ভারত ∆




১.
ভারতবর্ষের উদোম জঙ্গল থেকে ছুটে আসছে আমার
মা...
সারা গায়ে লেগে থাকা শাদা ভাত
আর ভাতেদের আত্মাহুতি!

কে- কার কাছে জানায় 
                                  প্রার্থনা...
যখন মুখুজ্জেদের ছেলে পিতার উদ্দেশ্যে তর্জনী নামিয়ে
শাল পাতায় ফেলে দেয় ভাতের ঢেলা
আর আমাদের কান্নাগুলি শুষে নেয় কোনো অ্যাক
কৃষকের গোলা ভর্তি ধান

আরও আরও চাপানো হয় পোড়া কাঠ!
জ্বলে ওঠে আগুন
জ্বলে ওঠে নাভি
যাই টুকুস করে ওদের দুটো ভাত দিয়ে আসি!

      

২.

কী হবে হেমন্তের বাতাসে এতখানি কাছাকাছি এসে
                                                     পড়ে থাকা জল
পৃথিবীর চাকা রাস্তা 
বরাবর দাগ রাখে 
অভিযোগ জানাবো না কোনো!  বিন্দু বিন্দু 
                                   স্রেফ যেভাবে ভুলে যাওয়া যায়

তুমি তো জানো মাথা গোঁজার ঘর বলতে যা বোঝায়
                                              তা- ছিল না কখনও
টিউশনির টাকায় পা ভারী হয়ে ওঠে ক্রমশ
                                আজও গাঁয়ে বাঁদর এলে
                                আমাদের মটকা ভাঙে খুব

দেখি বাবার কিনে দেওয়া সেই পিত্তি কালারের 
সাইকেল
একশো মিটার দূরে তোমাদের ভারতবর্ষের রোড!

      

৩.

আমার মুখ ক্রমশ বাবার মুখের মতো হয়ে
উঠছে এখন!  আর
পারিবারিক অসুখ 
গাম্ভীর্য ছুটে যাচ্ছে গ্যাস চেম্বারের ভিতর

আমাদের হাত যেন হিম হয়ে গেছে কবে! 
                              মনে পড়ে কর্মশিক্ষা 
                              পরীক্ষার দিন বাবা হাতে ধরে
কীভাবে আঁকতে হয় ভারতবর্ষের মানচিত্র 

আর আমি মরাইয়ের ভিতর
থেকে বের করে আনতাম বোরোধান 
আর রেখায় রেখায় ভরে উঠত সেই সব ধানেদের আস্ত শরীর
                                                এ মানচিত্র অন্য এক রৌদ্রের
                                                অন্য এক ভারতবর্ষের 

যেখানে আমাদের বোরোধানেরা তড়কা ও রুটির গন্ধে বলে উঠবে
আমাদের ভাতেরা যেন দীর্ঘজীবী হয়!     

   


     
২।। ∆ মুদুন ∆



সারা রাত ঝমঝম ঝমঝম বৃষ্টি!
আর আমাদের টালির ফাঁক থেকে ঝরে পড়ছে
সেই সব দেবতাদের পা - ধোয়া জল

এক হাতে আমাদের বুকে 
টেনে নিচ্ছেন বাবা আর এক হাতে
মুড়ো ঝাঁটা নিয়ে বিড়বিড় করছেন 
                                        নিজেই-

মুদুনটা দেখছি না সারালেই নয়!
    
         




৩।।  ∆ দেওয়াল চিত্র ∆




আমাদের বাড়িতে দেওয়াল চিত্রের সম্ভার ছিল না
কখনও...

যখন খুব ছোটো ছিলাম দেখতাম
গরুরগাড়ি করে আনা হোত তেলিডাঙার মাটি
আর মা তাতে গোবর মিশিয়ে সুন্দর ভাবে
নিকিয়ে দিতেন দেওয়াল!

ফুটে উঠতো খড়ির দাগ...
আর খসে পড়া চাঙড়ার মাঝে মনে হোত
আমি আমার ঈশ্বর
                            দেখছি আজন্ম কাল...
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ!





অলংকরণ - অঞ্জন দাস

•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••

কবিতা

মাটি খোসা পর্ব-১

কবি বিশ্বজিৎ আঁকুড়ে এর কবিতা-




১।। ঋতুহীন কবিতা-গুচ্ছ 


১৫.

খোলাই আছে দুয়োর 
ছাঁচতলায় ঘটি ভর্তি জল ! 
পা ধুয়ে ঢুকে যাবে ? 
শুচি করবে আমার বিহান কাল...!

ধান-দুব্বো তেলের মঙ্গল  চাপিয়ে নেবে মাথায় ? 
এখানে উঠোন ভর্তি আমোদ, পাকা ধানের শীষ...
নবান্নের আলপনায় বেজে উঠছে সন্ধের মাদল 
শাঁখ আর মাগরিব সালাতে টকবগে হবে তুমি ? 

নাকি সবই ফালতু কথার মত পাঁচিল  হয়ে যাবে
                            মেখে নেবে? ভিন্ন কোনো রোদ.....  
   




১৯.


পাশ কেটে যে টান খুলে ফেলতে চাইছো  বারবার 
হাতড়ে নিচ্ছ হেমন্ত লতাটির গায়ে লেগে থাকা অন্য হিম
                                                   ভিন্ন রোদের আলো  

কান থেকে খুলে ফেলছ পুরনো দুল 
                                          পা থেকে সোহাগা নূপুর.....
ভেতর ঘরের পর্দাটা যে দুলছে !  নড়ে উঠছে সূর্য ওঠা ভোর.....
দেখ,  একটা বৃত্তের ভেতরেই কেমন  ঘুরঘুর করছ অনিচ্ছায়
তাকে কি কারাবাস বলবে? নাকি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবে
                                                                    হালচাল হাওয়ায়   
ভেতর ঘরের পাণ্ডুলিপি আমি তো পড়েছি 
উলটে-পালটে দেখেছি পাতা, শুঁকেছি  রাতে গন্ধ
                            সেখানে তো কোনো মূদ্রণ প্রমাদ নেই   
 
ঘৃণা করো অথবা পুজো....       
টুগের সিঁড়িটিকে  আমি প্রথম ধাপের গল্প বলি.....
  
গাছে উঠে যাওয়া বন্ধুটিকে এখনও আমি ঘৃণার রঙেই দেখি  



২৪.


তেতে উঠতে পারি না বলেই মাঝে মাঝে জ্বর আসে । সাথে মনখারাপের
 তীব্র গা-গরম। নিজেকেই খারাপ বেসে ফেলি বারবার । অথচ যত্নে ঢাকা 
দিই তোমাকে। জং ধরে। আঙুলে - গলায় -অন্তর দেশে।গণ্ডদেশ থেকে  যে 
ধীরস্রোত নেমে আসে । জাদুঘর থেকে যন্ত্রণা গ্রহণ করি। আমার কফিনেও
কী সেই দাগ লেগে আছে ! যাকে তুমি অন্তর-ক্ষত  নামে ডাকো.......   




২৬.

তবুও প্রতিটি সূচিপত্রে  তোমাকেই দেখতে চায় চোখ। ৯  আর ৮ এর 
ভাগে, ভাগফল ও ভাগশেষে। এই যে দীর্ঘ দূরত্ব ফেলে রেখেছ অনায়াসে। 
ছিলায় আর গাণ্ডীবের নিবিড় নৈকট্যে আঙুল ফসকে গেলেই কী কুপকাৎ হয়?
লক্ষ ও লক্ষ্মণরেখার! অবহেলা ছুঁড়ে দিলে লালন করি তাকে। পালন করি ঘৃণার 
গায়ে লেগে থাকা শোক। গায়েব করি অনিবার্য সব ভাঙন। তোমাকে স্পর্শ করতে 
কতটা পথ টপকাতে হয় অলিভিয়া!  কতটা শূন্যতা পেলে ঝেঁপে আসে কবিজন্ম? 
কেঁপে ওঠে জলের গভীরে  ঢিল দেওয়া ঢেউ........      


ছবি - মেহবুব গায়েন

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
 

কবিতা

মাটি খোসা পর্ব-১

কবি বিপ্লব ভূঞ্যা’র কবিতা-






১।।   ∆ আলো পরিবার ∆



জানালা আমার বন্ধু না
জানালা আমার শত্রুও না
জানালা ও ঘরের মেডিটেশান
আমার মেডিটেশান ওপারে একটা সংবাদপত্র
একটা চিরকুটে ঝরে যাওয়া
কাঁচা সকালের
জানালা একটা সরলরেখা

আলোর পেছনে সাজিয়ে রাখা
সমার্থক আলো পরিবার ।





২।।  ∆ সমবায় শিখে নেবে ∆



স্বপ্ন পোষার একটা ছোট্ট মাঠ
উপহার দিয়ে ছিল বাবার সমান উঁচু সময়
সাবধানে কেটে ,কেটে বসালাম চারাগাছ
ভেবেছিলাম ওরাও সমবায় শিখে নেবে একদিন
না বুঝে পায়রা উড়ে গেল
ডানায় হাওয়া ভর্তি করে উড়ে আলো
জীবনা নদ ডুমুর গাছের দিকে
তারপর একদিন উড়ে আসার অভ্যেসে
দেখি নাম, গোত্র ,ভুল ঠিকানার
প্রুফ দেখে লাল কালির
সরলরেখা টেনে দিচ্ছে ক্রমশ ...




৩।।  ∆ অনন্ত ঘোড়ার দিকে ∆



ততদিনে তুমিও বিপ্লব আঁকছো
লিখছো কলেজ ক্যাম্পাস-সেলাই,স্টিচের
অভ্যেস
খুব করে লিখলে ওসব কিছু
ভেবেছিলাম তুমি ট্রেনের ঝিক,ঝিক !
                   তুমি আগুন!
                    তুমি কবিতা পাঠ!
সেই সব বাঁধানো বিপ্লব ফ্রেমে
পারিনা ওসব - আমার ব্যর্থ কলমবাস
তোমার বিপ্লবে গোলাপ পুঁতে দিতে
মেঘ মেয়েদের খোঁপার বাগান
আলাপে এনেছি
বিকেল মেয়েরা সূর্য পাঞ্জাবিতে
খোঁপা ডুবিয়ে মেহেন্দি শেখাছে





৪।।  ∆ পরিচিত রিয়্যালিটি শো ∆



একটা সাঁওতালি রাতের বুকে
চাঁদ সুন্দর ডুবে গেল
টোটোওয়ালার সিরিয়াল দেখা
বউ,আগে দেখেনি এইসব
পরিচিত রিয়্যালিটি শো
বিচিত্র চিত্র দেখতে দেখতে
টোটোওয়ালার বউ
                   ঝমকে ওঠে!
আর একটা শুক্লপক্ষ ফিরে এলে
ডুবে যাওয়া চাঁদ সুন্দর
উঠে আসে ঐ বুক থেকে

টোটোওয়ালার বউ দেখছে
মাঝে মধ্যে বিকল ফুসফুস
লিভার -ইনহেলার
কালো রাস্তা শুয়ে আছে
শান্ত চোখের মতন..




৫।।  ∆ তুমি -ঘ্রাণ হরিতকী ∆



তুমিও পেয়েছো সেদিন - কাঠমল্লিকার ঘ্রাণ
আমিও পেতাম তেমন
তারপর, তারপর তোমার ঘ্রাণের কাছে
সব ধুয়ে গেছে
ফুল হয়ে আমার মন্দির

কলেজ মোড় থেকে রাজাবাজার
এ পথ জুড়ে আশ্চর্য ভাতের গন্ধ
আর কোনও ঘ্রাণ আমার মনে নেই
কতগুলো শতাব্দী জুড়ে আমার
                                     ডায়ালোসিস
হাজারো বৃষ্টিপাত শেষে
তোমাকে আসেনা হরিতকী ঘ্রাণ
মাঝে ,মাঝে অরণ্য বীথিরা এসে
চোখের চাদর সরালে - আশ্চর্য ভাত

শতাব্দী বয়সী মা বেড়ে দেয়
                                 ভাতের ছায়া ...



অলংকরণ - মেহবুব গায়েন

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কবিতা

মাটি খোসা পর্ব-১

কবি অঞ্জন দাস এর কবিতা-






১।।  ∆ রাধিকা রসিক ∆



মাটির ওপর বিছিয়ে পড়ো যেমন তেমন
শান্তি খোঁজো ঝমঝমে দিন মেঘের মনে   
তুমি এলে গন্ধ চিনি বলেন মাটি
খাঁটি কথার একটি কথা শেকড় জানে

মানে বিহীন গর্জে ওঠেন তীক্ষ্ণ দুপুর
দুপুর মানে গল্প তো নয় সেসব দিনের
চেচিঁয়ে ওঠেন নীরবতা সময় কাবার
গরম বোধের বোধ মরেছে নিজের ফোনে

কোনর কোনে জমতে থাকে ঝলক নিনাদ
সেদিন হবে জমবে জলা ভরাট মাঠে
কাটিয়ে সময় আর কাটেনা বলবে তুমি
মেঘের মনে শান্তি বিলোই সূর্য পাটে




২।। ∆ আগুনের ধাতুরূপ ∆
             

সাত.


"তোমার হাতে ছুঁচ সুতোটি আমার হাতে ফুল
তাইনা দেখে বিশ্বজুড়ে হিংসা হুলুস্থুল"

প্রিয় কবি স্ব-ভূমি সীমানা লেখে পার্বত্য নদী ঢালু পথে 
জলডুবি সিনেমায় রিল ছোটে ভেসে ওঠে দহন মথুরা 
ল্যান্ডমাইন পোতা আছে বাঁশির ফোকরে কিছু লয়
মনে হয় হত্যা করি কলঙ্ক ভয়ের কিছু গানের পসরা  
 
পরাগে পরাগ ময় চোখ অন্ধকারে নামে খুশিগন্ধ রেণু 
ঘোরশাখা আলো খোলে অনন্ত পতনের প্রিয়  প্রসাধনী 
পাপড়ি ঠোঁটের কিছু মৌমাছি উড়ে যায় ফিরে আয় ঠোঁটে
ঝড় ওঠে রটে যায় খন্ডাংশ মেঘের পদ্য সংক্ষিপ্ত জীবনী  

 হলুদ পাখির শীষে ঘন হয় টি শার্ট  লবঙ্গ প্রশাখা
 অল্প বয়সী জলে কোমরের যন্ত্রণা ঢালে নলকূপ  
ততটাই  শীতল বোধ যতটা উষ্ণ রাখো রোদের বর্ণনা
প্রতিবারে লেখো"তোমাকে ছোঁয়ালে কমে আমার অসুখ"    

 



৩।। ∆ ঝড় খোলা জামা ∆



সাত.

উত্তরা থেমে যায় ফ্রিজ খোলা দেহে
খিদে পচে  সপ্তরথী আপন মানেনা
জন্মপ্যাঁচ ফেরি গায়ে সমুদ্র বানালো 
শামুকের মেরুদণ্ডে মুক্তি কামনা
   
জাতীয়তা ভাঙে রোজ অমেরু বাতাস
আত্মলোভ মুণ্ডুহীন দাঁড়িয়ে বসতি
হিংসা ক্রোধ সংস্কৃতি চাপলে আঁঙুলে
চক্রবৃদ্ধি  সুদ গোনে রাধিকার পতি





৪।। ∆ চেষ্টাচরিত্র ∆

 
 
আমি চাঁদ নই তোমার আলোয় আলোকিত আমি হবো
বৃষ্টি হতে চাই বার বার 
অক্ষরে মেঘ শব্দ যেবার অমনিই ঝরে যাবো     

পায়ের পয়ার কন্ঠে বাজাবে সুর
হাতের কালি রঙ দেবে দাও মনে
তোমার আপন মহিত শাসনে 
বুক থেকে হিরে খুলে নিতে জানে
কানে কানে ওড়া ঝড়ের পাখিকে 
টুকরো খড়ের ঘর তুলে দেবে 
ধুলো বাতাসের গতি ঢেকে দেবে নরম হাতের পাতা
তুনি ত্রাতা নও আমিও তোমার কোনকালে নই দাতা

একটি কলমে কথা অমৃত দুজনেই ভাগ নেবো 
আংটি বানাবো যে যার মাপে ধাতুজীবনের খাদে পরমাদে
আমি চাঁদ নই তোমার আলোয় আলোকিত আমি হবো 
অক্ষরে মেঘ শব্দ যেবার অমনিই ঝরে যাবো




৫।। ∆ রেলিং এ ডোরা ডোরা গতমাসের বিবাহ বার্ষিকী ∆



একটি কার্তুজ
নিশানা টোল খাচ্ছে উপত্যকায়
ছুটে গেলে মৌন বিছায় শীষ
পাখিদের  যুদ্ধগত বাসায়    
নিখোঁজ অরন্য  হৃদপদ্মনাভী
 আর তার কারেন্ট পাসপোর্ট।

গত মরশুমে হরিণ জল ছিল  পিলুং ঝর্ণায়
 প্রবাসী উপত্যকা টাটকা জয়ীতা কাশ্মীর  
আর একটি ইলেভেন্থ আর্য রমণী
ওরা সব বাড়ি ফিরে গেছে জমে গেছে সীমাহীন
দৃঢ়তা খুঁজতে এসে নদী হবো সে উত্তাপ ছিলনা আমার

 তবু বলি মন্টি মনা এসপ্তাহ কিচ্ছু হবেনা
হাতখালি ড্যামেজ কার্তুজ

পাকা রোদ মুশম্বি বাগানে কিছু  নষ্ট করেছি
নষ্ট জানালা গায় কাঁঠালের মাছি 
রেলিং এ ডোরা ডোরা গত মাসের বিবাহ বার্ষিকী
 আমাকে শুয়োর  দামে বেচে দাও সীমান্ত রক্ষীরা ফিরেছে  
একটি কার্তুজ
নিশানা টোল খাচ্ছে উপত্যকায়।




অলংকরণ - অমৃতা নায়ক

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কবিতা

মাটি খোসা পর্ব-১

কবি কুমারেশ তেওয়ারী’র কবিতা-





১।।  ∆ ছুঁচসুতো ∆



সেলাইয়ের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আত্মমগ্ন হই
যেখানে যা ছেঁড়াফাটা, জাগতিক বিস্ফোরক ভ্রম
আনাড়ি আঙুলে রাখি নবিসের সেলাই প্রয়াস
আলোর পর্দার ফাটা অংশ দিয়ে জায়মান কালো
অন্ধকার, ঢুকে আসে ভাঙনের কাল স্রোত হয়ে
সেখানে সেলাই দিই তড়িঘড়ি, অমৃতজাতক

ছুঁচের ছিদ্রের পথে সুতো পরাবার কালে দেখি, 
ওইপারে অভিসার, বৃন্দাবন, বিনোদিনি রাই
গোপন হাঁড়িতে রাঁধে হিরণ্ময় ভাতের সুঘ্রাণ

বিত্রস্ত আলোকে ঠাট, বিভঙ্গের সামান্য বদল 
টেরিকাটা শ্যাম দেয় অনন্তের ফুঁয়ের নিদান
এখনও অপাপবিদ্ধ, থেকে থেকে তাহার বাঁশিটি
কঠিন আখরোটের হৃদভেজানো মর্মধ্বনি তোলে 

সুতোতে নিদান রেখে ছুঁচছিদ্রে সযত্নে পরাই
রাই অঙ্গ ছুঁয়ে সুতো শ্যামতনু কেমনে বেড়ায়!





২।।  ∆ গৃহ ∆



আমার যে ঘর, তাকে গৃহ বলতেই ভালোবাসি
আমাকে প্রাচীনপন্থী যদি বলো
পদাবলী থেকে শুনিয়ে দেবই আনপথ কথা
বিদ্যাপতির ‘তাতল সৈকত’ থেকে
তপ্ত বালি এনে দেখাবো তোমাকে
বালির হৃদয়ে এখনও রয়েছে লেগে
                                           অনন্ত পিপাসা

শুদ্ধ ও কোমল নি-র দিকে ঠেলে দিয়ে
তোমার পায়ের গোছে বেঁধে দেব নাচের ময়ূর
অতঃপর নাচ-মুদ্রাটির থেকে তুলে নিয়ে
ফুলবন 
আমারই ঘরের কাছে এসে চেঁচিয়ে ডাকবো,
ও আমার গৃহ দরজা খোলো
হ্যাঙ্গারে ঝোলানো জামাটির ছেঁড়া বোতাম এখন
খোঁজ করবো আমি, চোখের নিশিপদ্মে নীল আলো জ্বেলে

ছুঁচসুতো কি সেতু হয়ে উঠতে পারেনা? সম্পর্ক সেলাই?




৩।।  ∆ মৌচাক ∆



তালা খুলে ঢুকে যাও অন্ধকার ঘরের ভেতরে
হয়তো প্রথমে দেখতে পাবে না কিছু
সাদা দেয়ালগুলিও যেন লুকিয়ে রেখেছে রং
পরীক্ষা নিচ্ছে তোমার 
কতটা আলোক আছে চোখের মোহনে

ম্যাঁও শব্দে লাফ দিয়ে তোমাকে ডিঙিয়ে যাবে
কোনো এক বেড়ালের চোখ
কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে পুনরায় থিতু হয়ে তাকাবে আবার
দেখবে কীভাবে রূপ নিচ্ছে আলো
প্রতিটি আসবাবের থেকে, বেরিয়ে আসছে নৃত্য আর বাক

তোমার ভেতরে মধু, গড়িয়ে নামছে 
বুঝে নিয়ো অতলান্তে জেগেছে মৌচাক




৪।। ∆ বিষদাঁত ∆



বিষদাঁত নিয়ে কতখানি খুশি, সাপ?
এই প্রশ্নে মাথা চুলকোতে চুলকোতে এক বক
উড়ে যায় দিগন্ত ছাড়িয়ে
ঠোঁট থেকে তার খসে পড়ে মাছ

কিছুটা দৌড়ে যাই, উত্তর চাই উত্তর চাই

ততক্ষণে একটি কাঠবিড়ালি 
আমাকে একটুকরো উপহাসে ভাসিয়ে দিয়েই
দৌড়ে উঠে যায় তার গাছের কোটরে
কিছু পরে ঠোঁটে চেপে ধরে নিয়ে আসে
শুকিয়ে যাওয়া একটি বিষদাঁত
উপুড় করতেই ঝরঝর ঝরে পড়ে জ্যোৎস্নার হাসি

আমিও উত্তর চাই বলতে বলতে 
দৌড়ে যাই আলের দিকে
সেখানে তো এক অতিবৃদ্ধ সাপ বহুকাল ধরে
দেখে আসছি তার আয়ুক্ষয়

বিষদাঁত নিয়ে খুশি তো হে বয়ঃবৃদ্ধ সাপ?
যেই খুলেছে হাঁ, দেখি, তার মুখের ভেতরে
থাম ভেঙে বেরিয়ে আসছেন নরসিংহ!
প্রহ্লাদের হাতের ভেতরে প্রাচীন বিষ্ণুপুরাণ!



অলংকরণ- মেহবুব গায়েন

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°